বন্ধুরা, আমরা তো প্রায়শই খবরে দেখি নতুন নতুন দেশের জন্ম বা পুরোনো দেশের সীমানা পরিবর্তন। কিন্তু সত্যিই কি আমরা এর পেছনের গল্পটা জানি? ইউরোপের বুকে এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হলো কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণা। এটি শুধু একটি দেশের মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, বরং যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রাম, আন্তর্জাতিক আইন ও রাজনীতির এক জটিল আখ্যান। কসোভোর এই যাত্রাপথ আজও অনেক বিতর্ক আর আলোচনার জন্ম দেয়, যা বিশ্বজুড়ে সার্বভৌমত্ব ও স্বাধিকারের ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমার মনে হয়, এই ঘটনা থেকে আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নানা দিক সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পারি। তাহলে চলুন, কসোভোর এই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় ধাপে ধাপে জেনে আসি!
বলকানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কসোভোর মাটি ও মানুষের গল্প
বন্ধুরা, কসোভোর গল্পটা জানতে গেলে আমাদের ইউরোপের বলকান অঞ্চলের ইতিহাসের গভীরে ডুব দিতে হবে। এই অঞ্চলটা যুগ যুগ ধরে সাম্রাজ্য আর জাতিগোষ্ঠীর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে উত্তাল ছিল। কসোভোর মাটি কেবল পাথর আর ধুলো নয়, এখানে মিশে আছে অজস্র মানুষের হাসি-কান্না, রক্ত আর স্বপ্ন। প্রাচীনকাল থেকেই কসোভো বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল – বুলগেরীয়, বাইজেন্টাইন এবং পরবর্তীতে সার্বিয়ান রাজ্যগুলোর অংশ হয়ে ওঠে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে অটোমান সাম্রাজ্যের আগমনের পর। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে কসোভো অটোমান শাসনের অধীনে ছিল, আর এই সময়েই সেখানকার জনসংখ্যার গঠনে বড় পরিবর্তন আসে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, একটা অঞ্চলের ইতিহাস কতটা জটিল হতে পারে, কসোভো তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখানকার প্রতিটি গ্রামের গল্প, প্রতিটি পাথরের ভাঁজে লুকিয়ে আছে শত শত বছরের পুরোনো কাহিনি। এই ইতিহাস জানাটা খুব জরুরি, কারণ এর গভীরে না গেলে কসোভোর স্বাধীনতা সংগ্রামের আসল কারণটা বোঝা মুশকিল।
সার্বিয়ান দাবি ও জাতিগত সংঘাতের বীজ
সার্বিয়ানদের কাছে কসোভো এক পবিত্র ভূমি, তাদের জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কসোভো জয় করে এবং বহু সার্বিয়ান অর্থোডক্স গির্জা ও মঠ এখানে নির্মাণ করে। এই মঠগুলো আজও কসোভোর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে। এই যেমন পেজায় প্যাট্রিয়ার্কেট, গ্রাকানিকার গির্জা বা ভিসোকি দেকানির মঠ, এগুলো কেবল স্থাপত্য নয়, সার্বিয়ানদের কাছে এগুলো তাদের সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। তাদের বিশ্বাস, কসোভোর যুদ্ধের পরই (১৩৮৯ সালে) এই অঞ্চলের ওপর তাদের দাবি আরও দৃঢ় হয়। আমার মনে হয়, এই আবেগটা বুঝতে পারা খুব দরকারি। একটা জাতি যখন তাদের ইতিহাস আর ধর্মকে এক করে দেখে, তখন সেই বন্ধন ছিন্ন করা কতটা কঠিন, সেটা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। এই ঐতিহাসিক দাবির কারণেই কসোভোর সার্বরা আজ পর্যন্ত কসোভোকে সার্বিয়ার অংশ বলেই মনে করে, আর স্বাধীনতার ঘোষণাকে তারা দেশের হৃদপিণ্ডকে কেটে আলাদা করার মতো বেদনাদায়ক মনে করে।
আলবেনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা
অন্যদিকে, কসোভোর বেশিরভাগ মানুষ জাতিগতভাবে আলবেনীয়। তাদের দাবি, তারা ইলিরিয়ানদের বংশধর এবং হাজার হাজার বছর ধরে এই মাটিতেই বসবাস করে আসছে। অটোমান শাসনের সময় থেকেই কসোভোতে আলবেনীয় জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে কসোভোর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল জাতিগত আলবেনীয়। যুগোস্লাভিয়ার অধীনে থাকাকালীন, বিশেষ করে টিটোর শাসনামলে কসোভো স্বায়ত্তশাসন লাভ করেছিল, যা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি, যখন একটি জাতিগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও তাদের অধিকার সীমিত করা হয়, তখন কেমন করে ভেতরে ভেতরে বিদ্রোহের আগুন দানা বাঁধে। আলবেনীয়রা চেয়েছিল তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও পরিচয়ের স্বীকৃতি, আর এই আকাঙ্ক্ষাই তাদের স্বাধীনতার পথে নিয়ে যায়।
যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন এবং কসোভোর যুদ্ধ
১৯৯০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন শুরু হলে বলকান অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। একের পর এক দেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করতে থাকে, আর এই প্রক্রিয়া প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। কসোভোও এই ঢেউ থেকে বাদ পড়েনি। আমার মতে, সেই সময়টা ছিল চরম অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কার। প্রতিদিনের খবরে আমরা দেখতাম সংঘাত আর ধ্বংসলীলার চিত্র। কসোভোর মানুষও জানতো যে তাদের সামনে কঠিন দিন আসছে, কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্ন তাদের চোখে মুখে ছিল উজ্জ্বল। সার্বিয়া যখন তাদের স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করে নেয়, তখন থেকেই আলবেনীয়দের মধ্যে প্রতিবাদের সুর আরও চড়া হয়, যা পরবর্তীতে সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়।
স্বায়ত্তশাসন হারানো ও প্রতিরোধের জন্ম
১৯৯০ সালে সার্বিয়া কসোভোর স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা প্রত্যাহার করে নেয়। এই ঘটনা কসোভোর আলবেনীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। তারা এটিকে তাদের অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখে। যুগোস্লাভিয়া এবং বিশেষ করে সার্বিয়ার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আলবেনীয়দের বিরোধিতা বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ ও দাঙ্গার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। প্রথমদিকে অহিংস প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলেও, পরে কসোভো লিবারেশন আর্মি (KLA) গঠিত হয় এবং ১৯৯৬ সাল থেকে সশস্ত্র পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। KLA একটি গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে, যার ফলে সার্ব নিরাপত্তা বাহিনী এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নিয়মিত হামলা হতে থাকে। আমি মনে করি, যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই মানুষ বাধ্য হয় অস্ত্রের আশ্রয় নিতে। কসোভোর ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই হয়েছিল। তাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এতটাই তীব্র ছিল যে তারা যেকোনো মূল্যে তা অর্জনের জন্য প্রস্তুত ছিল।
ন্যাটোর হস্তক্ষেপ: যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক পদক্ষেপ
১৯৯৮-৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধ ব্যাপক আকার ধারণ করে। সার্বিয়ার সেনাবাহিনী কসোভোর আলবেনীয়দের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালাতে শুরু করে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৯৯ সালে নেটো সামরিক জোট কসোভোর পক্ষে হস্তক্ষেপ করে এবং সার্বিয়ার ওপর বিমান হামলা চালায়। আমার মনে আছে, সেই সময় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রতিদিন ন্যাটোর হামলার খবর প্রচারিত হতো। এই হস্তক্ষেপ কসোভো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সার্বিয়াকে তার সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করে। যুদ্ধের পর কসোভো জাতিসংঘ প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে চলে আসে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক চাপ কখনো কখনো কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যখন একটি জাতি চরম বিপদে পড়ে।
স্বাধীনতার ঘোষণা: এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
দীর্ঘ সংগ্রাম, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর আন্তর্জাতিক আলোচনার পর অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, কসোভোর জনপ্রতিনিধি সমাজ একতরফাভাবে তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এই ঘোষণা ছিল কসোভোর আলবেনীয় জনগণের শত বছরের স্বপ্ন পূরণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমার মনে হয়, যেকোনো জাতির জন্য স্বাধীনতা ঘোষণা করা এক অসাধারণ অনুভূতি। সেই দিনের চিত্রটা আমি এখনও যেন চোখের সামনে দেখতে পাই।
প্রিস্টিনার উৎসব, বেলগ্রেডের ক্ষোভ
কসোভোর রাজধানী প্রিস্টিনায় সেই দিন ছিল উৎসবের আমেজ। শহরের আকাশ-বাতাস কাঁপছিল মানুষের উচ্ছ্বাস আর আতশবাজির ঝলকানিতে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল, তাদের চোখেমুখে ছিল স্বাধীনতার আনন্দ আর এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেখার উচ্ছ্বাস। নতুন নীল-সোনালি পতাকা উড়ছিল শহরের পথে, যা এক নতুন আত্মপরিচয়ের প্রতীক। আমি যদি সেই মুহূর্তে সেখানে থাকতাম, আমারও হয়তো চোখ ভিজে যেত এমন দৃশ্য দেখে। কিন্তু প্রিস্টিনা থেকে মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার দূরে, সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। সেখানে উৎসবের বদলে জ্বলছিল ক্ষোভের আগুন। সার্ব পার্লামেন্ট কসোভোর এই ঘোষণাকে ‘অবৈধ’ ও ‘অকার্যকর’ বলে আখ্যা দেয়। তাদের কাছে কসোভোর স্বাধীনতা ছিল দেশের হৃদপিণ্ডকে কেটে আলাদা করে দেওয়া।
নতুন রাষ্ট্রের জন্ম ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
স্বাধীনতা ঘোষণার পর কসোভো প্রজাতন্ত্রের সংবিধান গৃহীত হয়, যা ২০০৮ সালের ১৫ জুন কার্যকর হয়। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে কসোভো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, তুরস্কসহ ১০০-এর বেশি রাষ্ট্র কসোভোকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশও ২০১৭ সালে কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমার মনে হয়, নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্ম আর বিশ্বজুড়ে তার স্বীকৃতি পাওয়া মানে হলো সেই জাতির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। যদিও সার্বিয়া এবং তাদের মিত্র দেশগুলো, যেমন রাশিয়া ও চীন, কসোভোর স্বাধীনতাকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির দোলচাল: স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতির টানাপোড়েন
কসোভোর স্বাধীনতার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম হয়। একদিকে যেমন বহু দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে, অন্যদিকে সার্বিয়া ও তার মিত্ররা এর তীব্র বিরোধিতা করে। আমার মনে হয়, এই পরিস্থিতিটা অনেকটা দাবার চালের মতো, যেখানে প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। এই টানাপোড়েন আজও বিদ্যমান, যা কসোভোর ভবিষ্যৎকে অনেকটাই প্রভাবিত করছে।
জাতিসংঘের ভূমিকা ও নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো
কসোভো এখনো জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করতে পারেনি। এর মূল কারণ হলো, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া এবং চীন কসোভোর স্বীকৃতিতে বাধা দিয়েছে। তাদের ভেটো ক্ষমতার কারণেই কসোভো জাতিসংঘের সদস্য হতে পারছে না। আমার মতে, জাতিসংঘের মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় এমন বিভেদ থাকাটা দুঃখজনক। এটি দেখায় যে, আন্তর্জাতিক আইন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ধারণাও কীভাবে পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে হার মানে। যদিও ২০০৮ সালে কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণার বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে একটি পরামর্শমূলক মতামত চাওয়া হয়েছিল।
দেশগুলোর বিভাজন: কে পাশে, কে বিপক্ষে?
আন্তর্জাতিকভাবে কসোভোর স্বীকৃতি নিয়ে দেশগুলো দুটি শিবিরে বিভক্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ২৮টি দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আবার, অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কো-অপারেশনের (OIC) সদস্যভুক্ত ৫৭টি দেশের মধ্যে ৩৭টি কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে, সার্বিয়া, রাশিয়া, চীন, ভারত এবং স্পেনসহ কয়েকটি দেশ এখনো কসোভোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। জি-২০ দেশগুলোর মধ্যে ১১টি কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, রাশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি। এই বিভাজনটা পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কতটা জটিল হতে পারে।
| দেশের অবস্থান | উদাহরণস্বরূপ দেশসমূহ | মন্তব্য |
|---|---|---|
| স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশ | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, বাংলাদেশ, তুরস্ক | এ পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১০৯টিরও বেশি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। |
| স্বীকৃতি না দেওয়া দেশ | সার্বিয়া, রাশিয়া, চীন, ভারত, স্পেন | প্রধানত রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে স্বীকৃতি দেয়নি। |
| জাতিসংঘের সদস্যপদ | এখনো পূর্ণ সদস্য নয় | রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে আটকে আছে। |
বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
কসোভো আজ স্বাধীন এক রাষ্ট্র, কিন্তু তার পথচলা এখনো চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। সার্বিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা তাদের জন্য বড় কাজ। আমার মতে, যেকোনো নতুন রাষ্ট্রের জন্য নিজেদের প্রমাণ করাটা খুবই কঠিন একটা কাজ। তবে কসোভো এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে বদ্ধপরিকর। আমি ব্যক্তিগতভাবে কসোভোর মানুষদের সাহস আর দৃঢ়তাকে স্যালুট জানাই।
সার্বিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা
সার্বিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কসোভোকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও, ২০১৩ সালের ব্রাসেলস চুক্তির অংশ হিসেবে কসোভোর প্রতিষ্ঠানগুলোর শাসন কর্তৃত্ব স্বীকার করেছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সার্বিয়া ও কসোভো বৃহত্তর অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতিতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুসারে সীমান্ত ক্রসিংগুলি উন্মুক্ত হবে এবং সার্বিয়া ও কসোভো তখন একে অপরের ডিপ্লোমা ও লাইসেন্সকে স্বীকৃতি দেবে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ভালো করতে সাহায্য করবে। আমি বিশ্বাস করি, আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব।
কসোভোর অর্থনৈতিক উন্নতি ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগদান
কসোভো একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতি সহ একটি উন্নয়নশীল দেশ। গত দশকে এটি দৃঢ় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কসোভো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক এবং ইন্টারপোলসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কসোভো ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্য হওয়ার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন দাখিল করেছে। যদিও এখনো অনেক পথ বাকি, তবে এই অগ্রগতিগুলো প্রমাণ করে যে কসোভো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করছে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একটি দেশকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কসোভোর এই যাত্রাপথ হয়তো দীর্ঘ, কিন্তু আমি আশাবাদী যে তারা একদিন সফল হবে।
글을마치며
বন্ধুরা, কসোভোর এই দীর্ঘ এবং জটিল যাত্রাপথ আমাদের অনেক কিছু শেখায়। একদিকে যেমন স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য সংগ্রাম, তেমনি অন্যদিকে জাতিগত বিভেদ আর ঐতিহাসিক দাবির টানাপোড়েন। কসোভোর মাটি আজও যেন সেই সব লড়াই আর স্বপ্নের প্রতিধ্বনি বহন করে চলেছে। আমার মনে হয়, যেকোনো জাতির জন্য নিজেদের পরিচিতি আর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করাটা কতটা জরুরি, কসোভো তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুদ্ধ শেষ হলেও, শান্তি প্রতিষ্ঠা আর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কাজটা যে কত গভীর আর সময়সাপেক্ষ, তাও আমরা কসোভোর গল্প থেকে শিখতে পারি। আমি সত্যি মন থেকে চাই কসোভো যেন তার সব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, আর সেখানকার মানুষ যেন সত্যিকারের শান্তির স্বাদ পায়।
알아দুেন 쓸মো িযেন তন িথম

১. কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণা একতরফা হলেও, এর বৈধতা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত দ্বারা সমর্থিত হয়েছে। তবে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে পূর্ণ সদস্যপদ এখনো অনিশ্চিত।
২. কসোভো এবং সার্বিয়ার মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বেশ কিছু চুক্তি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
৩. কসোভো একটি তরুণ রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও, এটি দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেছে।
৪. বলকান অঞ্চলের ইতিহাস শুধু কসোভো নয়, সার্বিয়া, বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রেও জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাতের কারণে অত্যন্ত জটিল। এই অঞ্চল নিয়ে আরও জানতে চাইলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও প্রামাণ্যচিত্র দেখা যেতে পারে।
৫. আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কীভাবে ছোট দেশগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে, কসোভোর স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির বিষয়টি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পরাশক্তিগুলোর প্রভাব এখানে স্পষ্ট।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সারসংক্ষেপ
কসোভো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, এটি বহু সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল এবং সার্বিয়ানদের কাছে এটি একটি পবিত্র ভূমি। অন্যদিকে, আলবেনীয়রা কসোভোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাই স্বাধীনতার দিকে চালিত করেছে। যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের পর সার্বিয়া কসোভোর স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাহার করলে সংঘাত শুরু হয়, যা ১৯৯৮-৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধে রূপ নেয়। ন্যাটোর হস্তক্ষেপের ফলে সার্বিয়ার সেনা প্রত্যাহার হয় এবং কসোভো ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতা ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিকভাবে কসোভোর স্বীকৃতি নিয়ে দেশগুলো দুটি শিবিরে বিভক্ত; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ দেশ স্বীকৃতি দিলেও, সার্বিয়া, রাশিয়া ও চীনসহ কিছু দেশ এখনো দেয়নি। জাতিসংঘে রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে কসোভো পূর্ণ সদস্যপদ পায়নি। বর্তমানে, সার্বিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং অর্থনৈতিক উন্নতি ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় যোগদান কসোভোর প্রধান চ্যালেঞ্জ। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছে এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: কসোভো কেন স্বাধীনতা ঘোষণা করতে বাধ্য হলো? আসলে এর পেছনের মূল কারণগুলো কী ছিল?
উ: আমার মনে হয়, কসোভোর স্বাধীনতার গল্পটা শুধু একটা তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটা বহু বছরের যন্ত্রণা আর সংগ্রামের ফসল। যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের পর, সার্বিয়া এবং কসোভোর আলবেনীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতিগত বিভেদ চরম আকার ধারণ করে। সার্বরা কসোভোকে তাদের ঐতিহাসিক ভূমি মনে করত, আর সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ আলবেনীয়রা চাইত নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার। আমার মনে আছে, যখন প্রথম এই খবরগুলো শুনতাম, মনে হতো যেন দুটো দল নিজেদের অধিকার নিয়ে যুদ্ধ করছে। কসোভোতে আলবেনীয়দের ওপর সার্ব বাহিনীর অত্যাচার, নির্বিচারে হত্যা, সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নীরব থাকতে পারেনি। ১৯৯৯ সালে ন্যাটোর হস্তক্ষেপের পর সার্বিয়ান বাহিনী কসোভো ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়, কিন্তু তারপরও উত্তেজনা কমেনি। এই পুরো প্রেক্ষাপটেই, আলবেনীয়রা বুঝতে পারছিল যে সার্বিয়ার অধীনে তাদের ভবিষ্যত নিরাপদ নয়, আর তাই ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। আমি যখন এই ইতিহাসগুলো পড়ি, তখন মনে হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই অদম্য জেদটাই হয়তো তাদের এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল।
প্র: কসোভোকে কি সব দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিয়েছে? আন্তর্জাতিকভাবে এর অবস্থানটা কেমন?
উ: না বন্ধু, দুঃখের বিষয় হলো, কসোভোকে এখনো পর্যন্ত বিশ্বের সব দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এটা একটা জটিল আন্তর্জাতিক বিতর্ক। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানির মতো বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশ কসোভোকে স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু সার্বিয়া নিজে, আর তার ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া, চীন ও স্পেনের মতো বেশ কিছু দেশ এখনও কসোভোকে সার্বিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই দেখে। জাতিসংঘেও কসোভোর পূর্ণ সদস্যপদ পেতে সমস্যা হচ্ছে, কারণ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া আর চীনের ভেটো ক্ষমতা আছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই ধরনের বিতর্কের কারণে নতুন একটি রাষ্ট্রের পথচলা কতটা কঠিন হতে পারে। যখন কোনো দেশ সবার স্বীকৃতি পায় না, তখন তাদের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সম্পর্ক সবকিছুতেই একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কসোভোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে; নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে তাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
প্র: কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণার পর তাদের সামনে কী কী নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছিল?
উ: কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণার পর তাদের সামনে নতুন করে বহু চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছিল, যা আজও তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি পুরোপুরি। আমি যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম গবেষণা করি, তখন অবাক হয়েছিলাম কতটা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হচ্ছে। প্রথমত, অর্থনৈতিক দিকটা ছিল বিশাল এক বাধা। একটা নতুন রাষ্ট্র হিসেবে অবকাঠামো উন্নয়ন, বেকারত্ব কমানো, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা – এগুলোর জন্য শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজন, যা তাদের ছিল না। তারপর আসে সার্বিয়ার সাথে সম্পর্ক। সার্বিয়া আজও কসোভোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য, এবং সার্ব জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে অনবরত উত্তেজনা লেগেই থাকে। এটা ঠিক যেন, আপনার বাড়ির পাশে এমন একজন প্রতিবেশী আছেন যিনি আপনাকে মানতেই চান না!
এছাড়া, দুর্নীতির মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও তাদের জন্য কম চ্যালেঞ্জ ছিল না। আমি দেখেছি, একটা নতুন দেশ যখন আত্মপ্রকাশ করে, তখন তার ভিত মজবুত করতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়। কসোভোও ঠিক সেই পথেই হাঁটছে, নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য তাদের সংগ্রাম আজও চলছে।






